অভিবাসন
কালের কণ্ঠ : বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশি ভিসা পাওয়া আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। সামগ্রিক চিত্রটা কী?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে দেড় থেকে দুই কোটি বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে বৈধ বা অবৈধভাবে বসবাস করছেন পড়াশোনা, কাজ বা অভিবাসনের উদ্দেশ্যে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আমেরিকা—সব জায়গায়ই বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বাড়ছে। কিন্তু এই বিস্তারের পাশাপাশি একটি বড় সমস্যাও তৈরি হয়েছে—ভিসার অপব্যবহার। আজ যে কঠোরতা দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ তিনটি—ভিসার মিসইউজ, ওভারস্টে ও ভুয়া ডকুমেন্ট। অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে কাজ শুরু করছেন। কেউ এক দেশে গিয়ে সেখান থেকে অন্য দেশে পালাচ্ছেন। কেউ স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজ করছেন। এই ঘটনাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলছে। ফলে দূতাবাসগুলো এখন বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাসপোর্টের ওপর আস্থা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতার ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক দুর্বলতা এবং অদক্ষ শ্রমিক বেশি পাঠানো।
কালের কণ্ঠ : এটা কি সাময়িক সমস্যা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : এটা সাময়িক নয়। এখন দেশগুলো তথ্য শেয়ার করে। একবার যদি কোনো দেশের নাগরিকদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, সেটা বদলাতে অনেক সময় লাগে। বাংলাদেশ এখন বহু দেশের কাছে ‘হাই রিস্ক প্রোফাইল’। ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের ওপর স্থায়ী বাড়তি ব্যাকগ্রাউন্ড চেক থাকতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের নীতিগত কঠোরতা বাড়াচ্ছে। এটা সাময়িক বলা যাবে না, কারণ এর একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। একবার যখন একটা দেশের পাসপোর্টের ওপর বা একটা দেশের মানুষের ওপর, কর্মীদের ওপর, স্টুডেন্টদের ওপর এ ধরনের কোনো কলঙ্ক লাগে, সেটা কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকে, চর্চায় থাকে।
কালের কণ্ঠ : কোন কোন দেশের ভিসায় বাংলাদেশিরা বেশি জটিলতায় পড়ছেন?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, ইতালির ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে জটিলতা বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে সিকিউরিটি লেভেল বাড়ানো হয়েছে, কানাডা কঠোর যাচাই করছে, যুক্তরাষ্ট্র বন্ডব্যবস্থা, ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত ইত্যাদি পদক্ষেপ নিয়েছে। দেখা গেছে, স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক ও ট্যুরিস্ট—সবখানেই সমস্যা, তবে কারণ আলাদা। স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে জাল অ্যাডমিশন লেটার, দুর্বল স্টাডি প্ল্যান, ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে কোর্সের মিল না থাকা বড় সমস্যা। ওয়ার্ক ভিসার ক্ষেত্রে ভুয়া জব অফার, নকল ওয়ার্ক পারমিট, দক্ষতার প্রমাণ না থাকা বড় কারণ। ট্যুরিস্ট ভিসার ক্ষেত্রে ট্রাভেল প্ল্যান অস্পষ্ট, দেশে ফেরার নিশ্চয়তা দুর্বল, ওভারস্টের আশঙ্কা বিবেচনায় ভিসা মিলছে না। মোটকথা, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পৃথিবীটা এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। শিক্ষা, শ্রমবাজার কিংবা ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রেই আমাদের নাগরিকরা বাইরে যেতে আগ্রহী হলেও সততার অভাব রয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে নেই। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ওই দেশগুলোতে ভিসাপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে।
কালের কণ্ঠ : জটিলতা এড়াতে সরকার ও আবেদনকারীদের কী করা উচিত?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : বাংলাদেশের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সক্রিয় তত্পরতা জরুরি। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশি নাগরিকরা ভুয়া কাগজপত্র, ভুয়া জব অফার বা ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট ব্যবহার করে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা না করেন। তা না হলে জটিলতা কমবে না, বরং বাড়বে। সবকিছুর মূলে দেখা যাচ্ছে, নথি জালিয়াতি, ভিসার অপব্যবহার ও ওভারস্টে। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে অন্য ভিসায় কনভার্ট করা, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভুয়া জব অফার, দুর্বল ট্রাভেল হিস্ট্রি—এসবের কারণে রিজেকশন বাড়ছে। পাশাপাশি অনেক আবেদনকারী তাঁদের দেশে ফেরার নিশ্চয়তা ও আর্থিক স্থিতি বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না।
কভিড-পরবর্তী বিশ্বে অভিবাসননীতিতেও কঠোরতা বেড়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি ও অতিরিক্ত অভিবাসনের চাপে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো দেশগুলো স্ক্রুটিনি বাড়িয়েছে। অনেক দেশে অভিবাসীর সংখ্যা স্থানীয় জনসংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সরকারগুলো নতুন করে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশি পাসপোর্টের ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা কমে যাওয়াও বড় কারণ। অনেক দেশে ধারণা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশি আবেদন মানেই নথি জালিয়াতির ঝুঁকি বা ভিসার উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল ভিসা নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে অন্য দেশে পালানোর ঘটনাও ধরা পড়েছে। দালালচক্রের এসব তত্পরতায় দেশের পাসপোর্টের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে ভিসানীতি আরো কঠোর হয়ে পড়ে।
কালের কণ্ঠ : ভিসা আবেদন ও ভিসার ব্যবহারের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর কোনো দুর্বলতা আছে কি না?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : ওপরের বিষয়গুলো বিভিন্ন দেশকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে, বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা নিতে বাধ্য করেছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক আবেদনকারী নিজের ভিসার শর্তগুলোই ভালোভাবে জানেন না। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেও ভিসার নিয়ম ভঙ্গ হয়। এই ভিসা রুল কমপ্লায়েন্সের অভাবও কঠোরতার বড় কারণ। শেনজেন ভিসার ক্ষেত্রেও নিয়ম ভাঙা হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, শেনজেন অঞ্চলে ১৫ দিন থাকলে, যে দেশে সবচেয়ে বেশি সময় থাকা হবে, সেই দেশের ভিসা নিতে হয়। আর প্রবেশও সেই দেশ দিয়েই করা উচিত, যে দেশ ভিসা দিয়েছে। অনেকেই এ নিয়ম না মেনে অন্য দেশ দিয়ে প্রবেশ করেন। এতে ভবিষ্যত্ ভিসায় ঝুঁকি তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো ‘বার্থ ট্যুরিজম’। কেউ ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে সন্তানের জন্ম দেন, সন্তান মার্কিন পাসপোর্ট পায়, কিন্তু মা-বাবা ভিসার মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসেন। পরে ভিসা নবায়নে জটিলতা দেখা দেয়, কারণ এই প্রক্রিয়াকে মার্কিন ভিসা কর্মকর্তারা ইতিবাচকভাবে দেখেন না। আবার অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টে ইনসু্যুরেন্স ব্যবহার করেন, এটিও সন্দেহের কারণ হয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, ভিসার শর্ত ভঙ্গ, উদ্দেশ্য বদল, তথ্য গোপন এবং নিয়ম না জানা—এই চারটি বিষয়ই বর্তমান কঠোর ভিসানীতির বড় কারণ।
কালের কণ্ঠ : আবেদনকারীদের সবচেয়ে বড় ভুল কী? সরকারের কী করা উচিত?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : আবেদনকারীদের সবচেয়ে বড় ভুল দালালের ওপর অন্ধ নির্ভরতা, ভুয়া কাগজ কপি-পেস্ট, অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্টাডি প্ল্যান এবং শেষ মুহূর্তে আবেদন। দেখা গেছে, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জাল অ্যাডমিশন লেটার, জব অফার—এসব দালালচক্র বানায়। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো দেশের আবেদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটা জাতীয় ক্ষতি। কয়েকজন জালিয়াতের কারণে পুরো দেশের পাসপোর্ট সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নেওয়া বন্ধ করেছে।
কালের কণ্ঠ : ভুয়া ডকুমেন্ট দিলে শুধু আবেদনকারী নয়, পুরো দেশের আবেদনকারীদের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : আমি আগেই বলেছি, ভুয়া ডকুমেন্টের ক্ষতি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সরাসরি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কিছু মানুষ নিজের সুবিধার জন্য জাল কাগজপত্র দিয়ে ভিসা নেয়, পরে বিদেশে গিয়ে ধরা পড়ে, ডিপোর্ট হয়। কিন্তু এরপর সংশ্লিষ্ট দেশটি পুরো বাংলাদেশের আবেদনকারীদের ওপরই কঠোরতা আরোপ করে। ফলে যাঁরা সম্পূর্ণ জেনুইন ভ্রমণকারী, শিক্ষার্থী বা কর্মী, তাঁরাও ভোগান্তির শিকার হন।
অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের আগের সার্টিফিকেট জাল, আইইএলটিএস সনদ জাল। এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়লে পুরো দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন ভিসা রিজেকশনের হার বেড়ে যায়, নতুন কঠোর নীতি আসে। কোথাও বন্ড সিস্টেম চালু হয়, কোথাও ভিসা স্থগিত হয়। যেমন—ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কিছু নাগরিক ট্রাভেল ভিসায় গিয়ে কাজ শুরু করা বা সেখান থেকে অন্য দেশে পালানোর চেষ্টা করায় ভিসানীতি কঠোর করা হয়। ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট, ভুয়া ডকুমেন্ট দেশের পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। একসময় দূতাবাসগুলো আলাদা করে বিচার না করে পুরো জাতিকেই উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে দেখে।
কালের কণ্ঠ : সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের কী কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্যোগ দরকার বলে মনে করেন?
মহিবুল ইসলাম মাসুম : এই সমস্যার সমাধানে দুই স্তরেই কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। কূটনৈতিক পর্যায়ে করণীয়র মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, ভিসা ও অভিবাসন ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরিমাণ বাড়াতে হবে। যে দেশগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, কর্মী ও ভ্রমণকারী বেশি যান, সেই দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দূতাবাসগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ থাকতে হবে। ভিসাপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতি নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমন্বিত কূটনৈতিক তত্পরতা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, দূতাবাসগুলোর ভূমিকা শুধু কনস্যুলার সেবা নয়, বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংও। দক্ষ রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তারা প্রবাসে বাংলাদেশের ইতিবাচক ইমেজ তুলে ধরতে পারেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে সাংস্কৃতিক, একাডেমিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম আয়োজন করলে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ে, আস্থা তৈরি হয়। তৃতীয়ত, সরকারকে নতুন শ্রমবাজার ও শিক্ষা গন্তব্য খুঁজতে হবে। আমরা এখনো সীমিত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও পর্যটনের জন্য নতুন নতুন দেশের সঙ্গে চুক্তি করা দরকার। এ ক্ষেত্রে প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত সফল বাংলাদেশিদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগানো যেতে পারে।
এ ছাড়া প্রশাসনিক পর্যায়ে ভুয়া ডকুমেন্ট ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো যেতে পারে। জাল স্পন্সরশিপ, ভুয়া জব অফার, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট—এসবের সঙ্গে জড়িত এজেন্সিগুলোকে আইনের আওতায় এনে বড় অঙ্কের জরিমানা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও নিরাপদ এজেন্সির তালিকা তৈরি করতে পারে। নিয়মিত মনিটরিং, অডিট ও ইন্সপেকশনের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম তদারক করা উচিত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।